We need to ensure that the future of all girls and boys is secure and unmolested. Boys need to be taught how to respect the female of the species. Otherwise we fail as a civilization.
– Dr Ketaki Kushari Dyson (December 31, 2012)

“I don’t wait for moods. You accomplish nothing if you do that. Your mind must know it has got to get down to work.”
– Pearl S. Buck

“You must be the change you wish to see in the world.”
– Mahatma Gandhi

“Everyone has talent. What is rare is the courage to follow the talent to the dark place where it leads.”
– Erica Jong

“A man is but the product of his thoughts. What he thinks, he becomes.”
– Mahatma Gandhi

My Articles

এ মাসের গান – এলোমেলো কিছু স্মৃতি

লেখাটি প্ররম প্রকাশিত হয় বেতার জগতের তৃতীয় সংকলনে।

অরূপ ও চৈতী বহু দিন পর আমাদের বাড়ি বেড়াতে এসেছে। থাকবে কয়েক দিন। ওরা দুজন আমদের খুবই প্রিয়। ওরাও আমাদের মত গান-বাজনা ভালবাসে। তার ওপর আবার অরূপ খুব ভাল তবলা বাজায়। তাই ওরা আসার পর হারমোনিয়াম-তবলা বার করে বসে পরতে সময় বেশী লাগল না।

বেশ জমে উঠেছে আমাদের আসর। গানের ফাঁকে ফাঁকে চা-তেলে ভাজা সরবরাহ করে চলেছে দুই গিন্নী। অসীম কৃপা তাঁদের। লো-ফ্যাট, লো-সুগার, লো-কোলেস্টেরলের যুগে এই কম্বিনেশন্টা প্রায় উঠে যেতে বসেছে। আজ সব নিয়ম বাদ। ডিনারে আগে এটাই লাস্ট রাউন্ড ঘোষণা করল আমার গিন্নী। হাতে চায়ের ট্রে। ওর পেছনে চৈতী- তেলে-ভাজার প্লেট হাতে। একটা বিরতি দিতেই হল। চা তেলে-ভাজা পরিবেশন করা শেষ হবার পর চৈতীর অনুরোধ এলো আমার কাছে। ‘দেয়া নেয়া’-র একটা গান করবে? জীবন খাতার প্রতি পাতায়-‘ ওরা জানে, আমি শ্যামল মিত্রের এক নম্বর ফ্যান! অরূপও সায় দিল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। অনেক দিন শুনিনি গানটা তোমার গলায়।’

আমি হারমোনিয়ামটা আবার কাছে টেনে নিয়ে বললাম, “১৯৬৩ – পঞ্চাশ বছর হয়ে গেল, একেই বলে বোধহয় ক্ল্যাসিক! আজও ‘দেয়া নেয়া’-র গান আমরা শুনি।” গানটা শুরু করেই একটা দুষ্টু বুদ্ধি মাথা এলো। আমি গাইছি –

জীবন খাতার প্রতি পাতায়
যতই লেখ হিসাব নিকাশ
কিছুই রবে বা।
আমার আমার করেই শুধু
অহমবোধের মাঝে কিছুই
পূর্ণ হবে না।।

মুখ্‌রাটা শেষ করার আগেই অরূপ তবলা বাজানো বন্ধ করে আমার দিকে তাকাল। চৈতী ঠাট্টা করে বলল, ‘কথা ভুলে কি স্বরচিত? তুমি তো গানের কথা ভোলো না খুব-একটা?’

গান থামাতেই হল। “আরে বাবা, গানের কথা ভুলিনি। তোমাদের একটা অন্য ভার্শন শোনাচ্ছিলাম। এটাও গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার মশাই-এর লেখা। আকাশবাণী কলকাতা তখন প্রতি মাসে দুটি করে গান তাদের স্টুডিওতে রেকর্ড করত এরেঞ্জড মিউসিক সহ, যার একটি ‘এ মাসের গান’ অনুষ্ঠানে মাসের প্রতি রবিবার রাত ৮:২০তে ব্রডকাস্ট করা হত। গানটির কথা এবং স্বরলিপি আকাশবাণীর ‘বেতার জগৎ’ মাসিক পত্রিকায় প্রকাশিত হত। ‘জীবন খাতার প্রতি পাতায়’-এর এই ভার্শনটা খুব সম্ভবত ১৯৬৩ সালে ‘দেয়া নেয়া’ ছায়াছবি রিলিজ হবার আগের মাসের ‘এ মাসের গান’। ‘এ মাসের গান’ ছিল তখন কার দিনে আকাশবাণী কলকাতার খুবই জনপ্রিয় অনুষ্ঠান। আমি তখন খুবই ছোট। তবু সবাই মিলে ‘এ মাসের গান’ শোনার স্মৃতি এখনও স্পষ্ট।”

চৈতী আমার কথা খুবই মন দিয়ে শুনছিল। শেষ হতেই জিজ্ঞাসা করল, “তুমি তো দুটো গানের কথা বললে। দ্বিতীয় গানটা? সেটার কি হত?”

“দুটো গানই পরে আকাশবাণীর ‘রম্যগীতি’ অনুষ্ঠানে প্রচারিত হত। কত অসাধারণ সব গান শুনেছি ঐ সময়!” আমি আক্ষেপের সঙ্গে বললাম।

অরূপ তবলাটায় হাতুড়ীর কয়েকটা টোকা মেরে বলল, “তোমার টেপ-রেকর্ডারটা লাগিয়ে দাও। গানটা রেকর্ড করি।”

অরূপের কথামত টেপ-রেকর্ডারটা লাগিয়ে দিলাম। তারপর আবার শুরু করলাম-

জীবন খাতার প্রতি পাতায় যতই লেখ হিসাব নিকাশ
কিছুই রবে বা।
আমার আমার করেই শুধু অহমবোধের মাঝে কিছুই
পূর্ণ হবে না।।

ফুলে ফুলে মাটির ধুলায় যে বসন্ত আজ হাসে –
হায় যে গো ঋতু বদল, কাঁদাতে যে বর্ষা আসে।
‘পথ চলে ক্লান্ত তুমি থামো ওগো এই ঠিকানায়’,
কেউ তো কবে না।।

যে আঁখি হয়না খুশী আকাশ ভরা তারা দেখে-
সেই হাসে কাঁচের ঝাড়ে মোমের বাতি জ্বেলে রেখে।।

ভগবানের এই পৃথিবী ভরে গেছে আজ পাপে
মূর্খ হৃদয় আর বা কবে জ্বলবি রে তুই অনুতাপে
দয়াল মাঝি শেষের খেয়ায় মনটুকু ছাড়া কিছুই
সঙ্গে ব’বে না।।

গানটা শেষ করার পর চৈতী বেশ উৎসাহের সাথে বলল, “দারুণ! আরও কয়েকটা ‘এ মাসের গান’ গাওনা!”

অরূপ সায় দিয়ে বলল, “হ্যাঁ, ডিনারের আগে আরও কয়েকটা ‘এ মাসের গান’ হয়ে যাক।”

“বেশ, তাই হোক তবে!” আমি সানন্দে ঘোষণা করলাম। চায়ের কাপে ছোট্ট একটা চুমুক দিতে দিতে মন পাড়ছিল ছোট বেলায় আমাদের টু-ব্যান্ড ‘ন্যাশনাল ইকো’ রেডিওতে কলকাতা ‘ক’-এর অনুষ্ঠান শোনার দিনগুলি।  কলকাতা ‘ক’- ৪৪৭.৮ মিটার – ৬৭০ কিলো হার্টজ- আমাদের প্রিয় রেডিও স্টেশন। মায়ের বই পড়ার নেশা ছিল। তাই ‘বেতার জগৎ’-এর আমরা গ্রাহক ছিলাম। ‘বেতার জগৎ’-এ একাধারে যেমন আকাশবাণী কলকাতার অনুষ্ঠানের সময়সূচী প্রকাশ করা হত, তেমনি জনপ্রিয় লেখক-লেখিকাদের গল্প-উপন্যাস-কবিতাও ছাপা হত। ‘বেতার জগৎ’-এর অনুষ্ঠানসূচীতে প্রিয় শিল্পীদের অনুষ্ঠানের সময় পেনসিল দিয়ে চিহ্নাঙ্কিত করতাম। রবিবার দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার সেরে সবাই মিলে প্রথমে ‘রম্যগীতি’ এবং তারপর ‘অনুরোধের আসর’ শুনতাম আমরা; রাত্রে শুনতাম ‘এ মাসের গান’।

সী-শার্প মেজর কর্ডটা হারমোনিয়ামে ধরে, অরূপকে বললাম, “একটা অসাধারণ কম্পোজিশন শোনো। গানটির সুর দুনীচাঁদ বড়াল-এর। কথা পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়-এর। খুব সম্ভব ভি বালসারা সাহেব এরেঞ্জ করেছিলেন কারণ তিনি গানটিতে ইউনিভক্স বাজিয়েছিলেন। গেয়েছিলেন আমার প্রিয় শিল্পী শ্যামল মিত্র।”

গাইতে শুর করলাম –

কতটুকু তুমি জান?
তোমারে দিয়েছি কি যে?
তোমারে কাঁদাতে কেন বারেবার
আমিই কেঁদেছি নিজে।
তার কতটুকু তুমি জান?

নিয়েছ যে পরাজয়
সে তো মোর জয় নয়।
ব্যথা দিয়ে যেতে
কত ব্যথা সয়েছি যে
আমি নিজে
তোমারে কাঁদাতে কেন বারেবার
আমিই কেঁদেছি নিজে।
তার কতটুকু তুমি জান?

দিয়ে যাই যত ভুল
ঝরে মোর ফোটা ফুল।
ভুলে কাঁটাতে কত জ্বালা
কত জ্বালা বয়েছি যে!
তার কতটুকু তুমি জান?

গানটা শেষ হবার পর সবাই একটু চুপচাপ। গানটাই এমন। বালসারা-জী তাঁর ‘মনোফোনিক’ ইউনিভক্স ব্যবহার করে যা করতে পেরেছিলেন আমরা কেন তিন-চারটা পলিফোনিক সীকয়েন্‌সার ব্যবহার করেও পারিনা? অরূপই প্রথম নীরবতা ভেঙ্গে বলল, “কি অসাধারণ কম্পোজিশন! এ রকম গান আজকাল আর শোনাই যায় না। আরও একটা হয়ে যাক।”

একটা অন্য মেজাজের গান ধরলাম। ১৯৭০ সালের, সলিল চৌধুরীর কম্পোজিশন, শ্যামল মিত্রের গাওয়া।

ওগো সুরঙ্গনা,
আমার এ ভাবনা
ছুঁয়ে তো ছোঁয়না
তুমি কত দূর?
কত দূরে আছ গো?।

মেঘে মেঘে বেলা যে কেটেছে।
ছায়া ঘিরে আছে বুকে সুধু যে।
মন মানে না বীণ বাজে না
সুরে সুরে শুধু ছলনা।।

পথে পথে দিন যে গিয়েছে
সুখে দুখে কত নদী বয়েছে
মন-ঝর্ণা আর ঝরে না
ঝরে যায় শুধু কামনা।।

গানটা শেষ হতেই আমার গিন্নী নিজের মনে বলল উঠল, “সুরটা যেন চেনা-চেনা লাগছে…”

আমি বললাম, “চেনা তো লাগবেই! ‘আনন্দ’ ছায়াছবির ক্রেডিট টাইটেল দেখানোর সময় ব্যাক্‌গ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে গানটার সুর ব্যবহার করা হয়েছিল। অনেক হিন্দি ছায়াছবির গানের অরিজিনাল বাংলা ভার্শন সলিল চৌধুরী আকাশবাণীর স্টুডিওতে রেকর্ড করেছিলেন ‘এ মাসের গান’ বা রম্যগীতি অনুষ্ঠানের জন্য। যেমন ‘চলে যে যায় দিন’ যার হিন্দি ভার্শনটা কিশোর কুমার গেয়েছিলেন ‘অন্নদাতা’ ছায়াছবির জন্য।”

গানটা ধরলাম। অরূপের গানটা জানা ছিল মনে হল। কিন্তু ও ধরল অনেক ধিমে লয়ে। আমি ওকে বললাম, “লয়টা বাড়বে।” বলেই মনে পড়ল, ইদানীং কালের একজন শিল্পী গানটা অনেক ধিমে তালে রেকর্ড করেছেন। গানটার মেজাজ, ‘নোট’-এর ‘সীকোয়েন্স’ এবং ‘কর্ড প্রগ্রেশন’ ধিমে তালে ঠিক জমে না। তাই শ্যামল মিত্রের গাওয়া টেম্পোতে গানটা আবার ধরলাম।

(ও) চলে যে যায় দিন দিন দিন।
নূপুর বাজে রিন ঝিন্‌ ঝিন্‌।
রজনী নামে জীবনে
সজনী আর ডেকো না।
বুকেতে বেঁধে রেখো না।
মহা-জীবনের ক্লান্তি-হরা মুগ্ধ করা
ঐ বাজে কার বীণ।।

কি যেন দিতে পারিনি,
ও মোর মনোহারিণী।
স্বপন বন-চারিণী
আমি যে তোমার।
ছিলাম ঘুমে মগন।
স্বপন হল ভগণ।
গেল যে বয়ে লগন হায়।।

জানিনা তবু জানি যে।
গহন মনে মানি যে।
তোমার মুখখানি যে
নয়নে আমার
সতত ভাসে স্মরণে
জীবনে কিবা মরণে।
ক্ষম গো ধরি চরণে হায়।।

গানটা শেষ করতে না করতে চৈতীর অনুরোধ এলো আরও কিছু সলিল চৌধুরীর রম্যগীতি শোনানোর যে গুলো পরে হিন্দি ফিল্মী গান হিসেবে জনপ্রিয় হয়েছে। আজ সন্ধ্যার এই সেশনটা মনে হচ্ছে রম্যগীতিই গাওয়া হবে। ধরলাম, সলিল চৌধুরীর ‘গুরু গুরু গুরু’ সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া। এই গানটির হিন্দি ভার্শন মুকেশ-জী গেয়েছিলেন ‘অন্নদাতা’ ছায়াছবির জন্য। ‘নয়ন হমারে, সাঁঝ সকারে’

গুরু গুর গুরু মেঘ গরজে
বিজুলি আকাশে আঁকা
এখানে আমি ওখানে তুমি
তবু দুজনায় একা।।

শোনরে ময়ূর,
পেখম মেলে তাথৈ নাচো এবার।
দাদুরী ও মন
গানে গানে আকাশ ভরো এবার।
সাধের বরষা নয়নে এলো যে নামি
এখানে আমি ওখানে তুমি
তবু দুজনায় একা।।

এসো দুজনায়
নয়ন ভরে কেঁদে কেঁদে মরি
বুক ভেসে যাক
দ্বিধার বাধা ভাসাক তাহার তরী।
যাওয়া আসা ভুলে মহাকাল যাক না থামি
এখানে আমি ওখানে তুমি
তবু দুজনায় একা।।

গানটা শেষ করে আমি আর অরূপ দুজনেই চায়ের কাপে চুমুক মারলাম একটা। চা এখনো একটু গরম আছে। তারপর বললাম, “অনেকে শুনলে অবাক হয় যে সলিল চৌধুরী তাঁর ‘হলুদ গাঁদার ফুল দে এনে দে’ ও ‘শুধু তোমারই জন্যে’ গান দুটি সবিতা চৌধুরীকে দিয়ে গাইয়েছিলেন আকাশবাণীর রম্যগীতি হিসেবে। ‘শুধু তোমারই জন্যে’ গানটি এখনকার জনপ্রিয় হিন্দি প্লেব্যাক গায়ক শান-এর বাবা মানস মুখোপাধ্যায় ১৯৬৯ বা ১৯৭০ সালে HMV-তে রেকর্ড করেছিলেন সে বছরের ‘পুজোর গান’ হিসেবে এবং মুকেশ-জী এর হিন্দি ভার্শন ‘ম্যায়নে তেরে লিয়ে হি’ গেয়েছিলেন ‘আনন্দ’ ছায়াছবির জন্য।”

অরূপ তবলাটা বাঁধতে বাঁধতে বলল, “এক অর্থে এই গানগুলো বাংলা আধুনিক গান।  অন্য অর্থে এই গানগুলির একটা নিজস্ব স্বত্বা থাকা উচিৎ বাংলা গানের ইতিহাসে। তাই না?”

আমি আক্ষেপের সুরে বললাম, “ঠিকই বলেছ। দুঃখের কথা এই যে এই গানগুলো ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে।”

“আচ্ছা, ‘রম্যগীতি’ কবে শুরু হয়েছিল?”, অরূপ জানতে চাইল।

“১৯৫৪ সালে আচার্য জ্ঞান প্রকাশ ঘোষ আকাশবাণী কলকাতা যোগদান করেন। ১৯৫৬ সাল নাগাদ ভি বালসারা সাহেবকে উনি আকাশবাণীতে নিয়ে আসেন। খুব সম্ভবত ঐ সময়ে বিশিষ্ট সানাই বাদক দক্ষিণা মোহন ঠাকুরও আকাশবাণী যোগদান করেছিলেন।  আকাশবাণীর কলকাতা থেকে ‘রম্যগীতি’র  সম্প্রচার শুরু হয় ১৯৫৬ সালে। ঐ সময়ে তখনকার কলকাতার বহু শিল্পী, গীতিকার, সুরকার রম্যগীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। একটা ঘটনার কথা বলি। আমার এক শালীর মেয়ে অজয় চক্রবর্তীর ‘শ্রুতি নন্দন’ শিক্ষালয়ের ছাত্রী ও স্নাতক। খুব ভাল ঠুংরি গায়। আমাদের বাড়ী বেড়াতে এসে জ্ঞান প্রকাশ ঘোষের কম্পোজিশন ‘কোয়েলিয়া গান থামা এবার’ গানটি শোনায়। গায়কী বেগম আখতারের অনুকরণ। বেশ ভাল গাইল। ওকে জিজ্ঞাসা করলাম, এই গানটি অরিজিনালি কার গাওয়া জান? ওর উত্তর আমাকে অবাক করেনি। বলল, ‘হ্যাঁ, বেগম আখতার।’ আমি মৃদু হেসে প্রশ্ন করেছিলাম, ‘বাণী কোনারের নাম শুনেছ? জ্ঞান প্রকাশ ঘোষ ওঁর শিষ্যা বাণী কোনারকে দিয়ে গানটি রেকর্ড করিয়েছিলেন আকাশবাণীর স্টুডিওতে পঞ্চাশ দশকের শেষের দিকে। গানটা গায়কী রোম্যান্টিক আধুনিক গানের মত ছিল। আমি ওকে গানটার রেকর্ডিং শুনিয়েছিলাম। অবাক হয়েছিল গানটি রেন্ডারিং শুনে।”

অরূপ গানটা তখনই শোনার ইচ্ছে বোঝাই। “শুনতে হবে তো অরিজিনালটা,” ও তবলায় মৃদু টোকা মেরে বলল।

আমি সহমত। “নিশ্চয়ই। ডিনার করতে করতে শোনা যেতে পারে।”

“সেই ভাল,” চৈতী বলল। “ততক্ষণ আরও কয়েকটা ‘এ মাসের গান’ হয়ে যাক।”

কেন জানিনা, ঘরোয়া পরিবেশে বাংলা গানে আসরে গানের ইতিবৃত্তি নিয়ে কথা বলা আমার যেন স্বভাবে দাঁড়িয়ে গেছে। বলতে শুরু করলাম, “অলক নাথ দে জীবনের বেশীর ভাগ সময় কাটিয়েছেন মিউজিক এরেঞ্জার হিসেবে। সুধীন দাশগুপ্ত থেকে সত্যজিৎ রায় – অনেকেই ছিলেন ওর ওপর নির্ভরশীল। উনি আকাশবাণীর স্টুডিওতে বহু শিল্পীদের দিয়ে গান গাইয়েছিলেন। তার একটি শ্যামল মিত্র কে দিয়ে গাইয়েছিলেন খুব সম্ভব ষাট দশকের গোঁড়ার দিকে। ‘আমার এ বেভুল প্রাণের সঙ্গোপনে’। গানটি যাকে বলে, আহেড অফ ইটস টাইম। বাংলা গানে এই গানটির মত কোরাসের ব্যবহার আজ অবধি আমি অন্য কোন গানে শুনিনি। যেন শ্যামল মিত্রের গাওয়া মেলোডির সাথে কোরাসের গাওয়া মেলডির কথোপকথন! একে অপরের পরিপূরক। আরও একটা বিশেষত্ব আছে। এই গানটা মুখ্‌রা এক লাইনের, প্রথম অন্তরাটাও এক লাইনের, দ্বিতীয় ও শেষ অন্তরাটা তিন লাইনের।”

গানটা ধরলাম-

আমার এই বেভুল প্রাণের সঙ্গোপনে।।

মধুর কি এক ব্যথার স্মৃতি ঝর্ণা ঝরে ক্ষণে ক্ষণে।।

চলার পথে এক চকিতে একদা যারে দেখে
মুগ্ধ আঁখি তাকিয়ে ছিল অবাক অনিমিখে।
আজও কি তার মরীচিকায় তৃষ্ণা জাগায় মনের কোনে।

হঠাৎ দেখার নিমেষ মাঝে হঠাৎ ভালো লাগা।
ক্ষণিক সুখের ঝলকানিতে চিকুর আলো রেখা।
আজও কি তার উতল আভাস কাজল রাতে চমক হানে।

গানটা শেষ করে বললাম, “এ গানটা একা ঠিক গাওয়া যায় না। আমার কাছে একটা রেকর্ডিং আছে। পরে শোনাব।”

গিন্নী ওয়ার্নিং বেল বাজাল। “দশ মিনিটে ডিনার রেডী হয়ে যাবে।”

“দশ মিনিট? দুটো গান হয়ে যাবে।“ অরূপের মন্তব্য। “আরও কিছু স্টকে আছে?”

“স্টকে?  ভি বালসারার একটা কম্পোজিশন শোনাই। বালসারা-জীর মত মিউজিসিয়ান ক্ষণজন্মা। ওর মত এরেঞ্জার খুব কম দেখা যায়। শ্যামল মিত্রের গাওয়া ‘ছল ছল নদী জলে তরী খানি ভেসে চলে অজানা টানে, সুদূর পানে।’ একটি অসাধারণ কম্পোজিশন। গানটার মধ্যে একটা ‘প্যাথোস’ রয়েছে। পিয়ানোয় রূপক তালের ছন্দ নৌকা বাওয়ার ছবি এঁকে দেন বালসারা-জী। এই গানটা হারমোনিয়াম বাজিয়ে না গেয়ে পিয়ানো বাজিয়ে করি।” উঠে আমার ইয়ামাহা ডিজিটাল পিয়ানোর সামনে বসলাম।

সাত মাত্রার ছন্দ – আমার ভীষণ প্রিয়। যা কিছু শাশ্বত যেন ‘সাত’-এই আসে। সুর-সপ্তক, সপ্ত ঋষি, সাত-রঙা রামধনু, সাত-সমুদ্র, সপ্ত গ্রহ, সপ্তাহ, সপ্তম স্বর্গ … সাতের ছন্দ যেন লুকিয়ে আছে সব কিছুর মধ্যে!

তরী খানি ভসে চলে
ছল ছল নদী জলে
অজানা টানে
সুদূর পানে।।

আশা পথ চেয়ে মম
কে গো দীপ জ্বালায়?
দিন গুনি ফুল গুলি
গেঁথে রাখে মালায়।
সমীরণ যেন তারই
ঠিকানা আনে।।

কি যে হল কেন সুধু
ভেবে চলি কুল
তারই খোঁজে বারে বারে
মিছে করি ভুল।

ফেলে যাওয়া তবু যেন
হল না কি যে মায়ায়
সবুজেরই স্বপনে যে
ভরে আঁখি ছায়া
এই পাড়ি যে সারা হবে
কবে কে জানে।।

আমার গলায় গানটা শোনা অনেকটা দুধের সাধ জলে মেটানোর মত। অরূপকে বললাম, “গানটার একটা রেকর্ডিং আমার কাছে আছে। ডিনারে করতে করতে শোনা যেতে পারে।” গানটা আমারও শুনতে খুবই ইচ্ছে করছিল। খুবই নস্ট্যালজিক। ছেলেবেলায় তো গানের কথার মানে বুঝতাম না। কোনটা প্রেমের গান, কোনটা ‘রোম্যেন্টিক’ গান, কোনটা ভক্তিগীতি বা দেশাত্মবোধক। আমাকে আকর্ষণ করত গানে সুর, মিউজিক এরেঞ্জমেন্ট, গলার টিম্বর, স্টাইল। এমন বাংলা গান কেন এখন আর শুনি না? অরূপও গানটা শুনে কিছুক্ষণ নির্বাক। তারপর হঠাৎই বলে উঠল, “আরও একটা গান হয়ে যাবে ডিনারের আগে।“

পি ভি কৃষ্ণমূর্তির একটা কম্পোজিশন ধরলাম। রম্যগীতি তথা ‘এ মাসের গান’ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে পি ভি কৃষ্ণমূর্তির কথা না বলে থাকতে পারলাম না। উনি আকাশবাণী কলকাতার স্টেশন ডিরেক্টর ছিলেন খুব সম্ভব ষাট দশকের শেষের দিকে। ঐ সময়ে তিনি বেশ কিছু গান গাইয়েছিলেন তখনকার দিনের দিকপাল শিল্পীদের দিয়ে। শ্যামল মিত্র, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় এঁরা সকলেই ওঁর সুরে গান রেকর্ড করেছিলেন। শ্যামল মিত্রের গাওয়া ‘বেলা হলে অবসান’ গানটি ছিল একটি ‘এ মাসের গান’। গানটির গীতিকার শ্যামল গুপ্তে।

বেলা হলে অবসান,সারা হয়ে এলে গান,
আমি তো হায় নেবো বিদায়
মুছে দিয়ে স্মৃতিটিরে।
মনে তোমার কিছু তো আর
ব্যথায় রবে না, রবে না ঘিরে।।

কখন তুমি যে ডেকেছিলে কাছে
মনে করাবো না জেনো।
আমার অবুঝ ভুলের মায়ায়
ফুলের মাধুরী এনো।
তোমার আকাশে ঘুম-ভাঙা হয়ে
আলোয় উঠুক ভরে।
আমার ক্লান্ত পথের প্রান্তে
ছায়া তার যেন ঝরে।
ও বাঁশী থাক, ও হাসি থাক
আমি ভাসি আঁখি নীরে।
মনে তোমার কিছু তো আর
ব্যথায় রবে না, রবে না ঘিরে।।

গান শেষ হওয়া মাত্র গিন্নী আওয়াজ দিল,’ডিনার রেডী।’ বিরতি দিতেই হল।  এগিয়ে গেলাম একটু সাহায্যের হাত বাড়াতে। তেমন কিছু না – গ্লাসে জল ভরে দেওয়া, প্লেট বার করা ইত্যাদি। এক ফাঁকে গিয়ে আমার MP3-প্লেয়ারটা চালিয়ে দিলাম। আমেজটা আনার জন্য ফোল্ডারেরে প্রথম ট্র্যাকটা সানাই-এ ও বাঁশীতে বাজানো রম্যগীতির বিখ্যাত সিগনেচার মিউজিকটা রেখেছি। নস্টালজিয়ার কোনও জুড়ি নেই! প্রথম গান গোবিন্দ চক্রবর্তীর লেখা, অনিল বাগচীর সুরে পিন্টু ভট্টাচার্যের গাওয়া খুব সম্ভবত ১৯৭৫ বা ১৯৭৬ সালের কোনও একটি মাসের ‘এ মাসের গান’ ছিল।

ওগো শ্রান্ত দিনের ভ্রান্ত পথিক পাখী
ডাকি যে, ডাকি যে নীড়ে
পান্থশালার সকল দুয়ার ঘিরে
আমি দীপমালা জ্বেলে রাখি।।

নয়ন তোমার সাগরের তীরে তীরে
তোমারেই শুধু তোমারেই খোঁজে ফিরে।
চির-জনমের হে অতিথি সুন্দর
আজও তোমারি যে ছবি আঁকি।।

কত ফাল্গুন পলাশ ফোটাল
পোহালো যে কত নিশি।
আমার ব্যথার নীরব সাক্ষী
রাতের সপ্ত ঋষি।

কোন অজানা-অচেনা কোন কুলে
তুমি অভিমানে বন্ধন ফেলে খুলে
যত দূরে যাও মোরে যে জড়াও তত!
আহা, সে বারতা জান নাকি?

পরের গান আরতি মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া একটি রম্যগীতি। গোপাল দাশগুপ্তের কথা ও সুর।

কিছুতেই আর কিছু মনে পড়ে না
ছায়া ছায়া সুরগুলি যেন বলে যায় –
‘অনেক দিনের ওগো তুমি যে চেনা’।।

বলতো কখন দেখা তোমায় আমায়
কি লগন লেখা ছিল রাতের তারায়-
সে দিন কি মাধবীর ভেঙে ছিল ঘুম?
সেদিন কি ফুটেছিল শ্রাবণী হেনা।
হায়, কিছু মনে পড়ে না।।

জীবনের বালুকা বেলায় –
সব দাগ মোছে নাতো
চাঁদ আর সাগরের জোয়ার খেলায়।।

নিথর হিমেল রাত, নীরব বীণা
তবুও দেখোতো ভেবে মনে পড়ে কিনা?
স্মরণের সৈকতে একটি প্রাণের
ঢেঊ-ভাঙা এক মুঠো শিউলি ফেনা।
হায়, কিছু মনে পড়ে না।।

পি ভি কৃষ্ণমূর্তি মানুবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় কে দিয়ে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা একটি গান গাইয়ে ছিলেন। শিব-রঞ্জনী রাগে ওপর আধারিত গানটি অনেকেই জ্ঞান প্রকাশ ঘোষের কম্পোজিশন মনে করেন। গানটি কর্ণাটক সংগীতের স্টাইলে গাওয়া।

নিভে গেল দীপ কেন?
মেঘে ঢাকে চাঁদ কেন?
কেন তবে ঝড়ে গেল ফুল?
এই পথ চাওয়া এ যেন ভুল।।

সুরভিত সেই হাওয়া
করে নাতো আসা যাওয়া
মন শুধু হল যে ব্যাকুল।।

আলো ভুলে যেন
ছায়া বুকে বাঁধি।
বোঝাতে পারিনি হায়
কেন আমি কাঁদি।।

মমতার মালা খুলে
তুমি আজ গেছো ভুলে
নদী যেন ভেঙে দিল কুল।।

পর পর চলছে – শ্যামল মিত্র, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, সবিতা চৌধুরী, আরতি মুখোপাধ্যায়, বাণী কোনার, ললিতা ঘোষ, সুমিত্রা সেন, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, অখিল বন্ধু ঘোষ, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়… প্রতিটি গান সাক্ষর বহন করে একটা যুগের।  হয়ত কয়েক শত রম্যগীতির মধ্য কয়েকটি এখনও বেঁচে আমাদের শোনার মত অবস্থায়। বাকী সব আমাদের মত কিছু গান-গাগলাদের স্মৃতির অন্তরে ঘুমিয়ে থাকে। মাঝে মধ্যে উঁকি দেয় তারা।

© 2015 - 2021 Raktim Sen. All rights reserved.