My Stories

সরলাদেবীর ‘কামিং টু অ্যামেরিকা’

[প্রথম প্রকাশিত: প্রতীচী ,২০০৬, পূজা সংখ্যা]


কামিং


ছোট নাতি কাবলুর হাত ধরে সরলাদেবী অ্যাটলান্টার হার্টস্‌ফিল্ড এয়ারপোর্টের বাইরে হতবাক দৃষ্টিতে যানবাহনের ব্যস্ততা দেখছেন। পাশে দাঁড়িয়ে ছোট ছেলে নিতুর বৌ মিতালি, বনানীর সঙ্গে কথা বলছে। সরলাদেবী বনানীর সঙ্গেই কলকাতা থেকে এসেছেন। মেয়েটি বড় ভাল। দু’দিন আগে যাকে চিনতেনই না, সে কেমন আপন করে এতটা পথ আগলে নিয়ে এসেছে। খাওয়া-দাওয়া, বাথরুম দেখিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে, এক প্লেন থেকে অন্য প্লেন ধরা, পাসপোর্ট, টিকিট, ইমিগ্রেশন, কাস্টমস- সব বনানীই সামলেছে। ওর স্বামী প্রদীপ ও নিতু গাড়ি আনতে গেছে পার্কিং লটে।

এরই নাম অ্যামেরিকা! আজ প্রায় বছর খানেক ধরে সকলেই সরলাদেবীকে রাজই করানোর চেষ্টা করেছে অ্যামেরিকায় ছোট ছেলের কাছে দু-তিন মাস বেড়িয়ে আসার জন্য। কিছুতেই রাজি করাতে পারছিল না কেউ। বেশি জোর করলেই বলেন, – অনেক দূর। আমার শরীর দেবে না। অবশেষে কাবলুর কথা ফেলতে পারলেন না। কাবলুর এক কথা, – ঠাম্মা, তুমি না এলে, আমিও আর যাব না। মা-বাবা গেলেও না।

তারপর আর কি? কাবলুর সাথে ফোনে কথা বলা শেষ হওয়া মাত্র বড় ছেলের গৌরের বাড়ি ফোন করলেন। অর ছেলে বাবলু ফোন তুলেছিল। সরলাদেবী ওকেই বললেন, – আমি কাবলুদের কাছে বেড়াতে যাচ্ছি!

ব্যস, যেই না বলা, বাবলু চিৎকার করতে আরম্ভ করেছিল, – মা, মা, ঠাম্মা অ্যামেরিকা যাচ্ছে! ঠাম্মা অ্যামেরিকা যাচ্ছে! বড় বৌমা রত্নার গলা শোনা যায়, – কি পাগলের মত চিৎকার করছিস? বাবলু অর মাকে ফোনটা দিয়ে বলল, – তুমি ঠাম্মার সঙ্গে কথা বলে নাও। তারপর আমি কাবলু কে ফোন করব। ওর সাথে কথা বলতে হবে।

রত্না শাশুড়ির সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলে বলল, – আমি এখুনি আসছি। দিদিরা জান?

সরলাদেবী উত্তর দেন, – তমাদেরই প্রথমে ফোন করলাম।

ওদিকে ততক্ষণে বাবলু ফোন কেড়ে নিয়েছে মায়ের কাছ থেকে। – ঠাম্মা, তুমি একদম চিন্তা কোর না। অ্যামেরিকা সম্বন্ধে সব শিখিয়ে দেব। রত্না ফোনটা কেড়ে নেয়। – যা যা, বড় ওস্তাদ এসেছে অ্যামেরিকার তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে। আর দেখ বিশু কোথায় গেছে। ওকে গাড়ি বার করতে বয়ল। ঠাম্মার বাড়ি যাব। তারপর শাশুড়িকে বলে, – মা, আমরা তোমার ওখানে চলে আসছি। তুমি দিদির সঙ্গে কথা বলে নাও। আমি একটু পরে ওদের ফোন করছি। ওরা যদি যেতে চায়, যাবার পথে ওদেরও তুলে নেব।

সরলাদেবী রত্নাকে বললেন, – তা হলে এখানেই দুপুরের খাওয়া-দাওয়া কোর। আমি সুমিকেও তাই বলছি। নয়না কে নিয়ে যেন এখানে চলে আসে।

ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যে সরলাদেবীর বেহালার বাড়ি গমগম করতে আরম্ভ করল। প্রথমে রত্না, সুমিতা, বাবলু ও নয়না। তারপর গৌর এবং জামাই বিকাশ। বিকাশ এসেই বলল, মা, একবার কাবলুদের ফোন করে নিতুর থেকে জানা দরকার আমাদের কি কি করণীয়। সরলাদেবী বললেন, – মিতা বলেছে পাসপোর্টটা আগে করাতে। তারপর ভিসার জন্য যা কাগজ পত্র লাগবে সব অরা পাঠিয়ে দেবে। গৌর অভয় দিয়ে বলল, – পাসপোর্ট হয়ে যাবে। আমি সোমবার আমাদের অফিসের ট্র্যাভেল এজেন্টকে লাগিয়ে দেব। কাল রত্নার সঙ্গে গিয়ে কয়েকটা পাসপোর্ট-সাইজের ছবি তুলে এনো। নয়না পাশের থেকে ফোড়ন কাটল, – ছোটমামা কতবার বলেছে, পাসপোর্টটা অন্তত করিয়ে রাখ। বিকাশ পাসপোর্ট করা নিয়ে চিন্তিত নয়। তাই বলে, – পাসপোর্ট হয়ে যাবে। আর কী কী লাগবে। বাবলু, এখন অ্যামেরিকায় কটা বাজে রে? এখন করা যাবে?

সরলাদেবী বললেন, – এখন ওখানে মাঝরাত হবে। মিতা তো সব সময় সকালবেলা ফোন করে। সকাল আটটার মধ্যেই করে। আর রাতে করলে সাড়ে দশটার মধ্যে।

বিকাশ এখনই ফোন করতে চাই। – এই বাবলু, অ্যামেরিকার সঙ্গে আমাদের টাইম-ডিফারেন্স কত রে?

বাবলুর জেনারেল নলেজের ওপর অনেকই নির্ভরশীল। বাবলু বয়সের তুলনায় অনেকটা বেশী গাম্ভীর্য এনে বলল, – অ্যামেরিকায় কটা টাইম জোন জান? কাবলুরা তো রস্‌ওয়েল-এ থাকে। রস্‌ওয়েল মনে হয় ওয়েস্টে। তা’হলে আমাদের সঙ্গে সাড়ে তেরো… না, এখন তো সামার… সাড়ে বারো ঘণ্টা পিছিয়ে। এখন ওখানে মাঝ রাত্তির।

নয়না ভাই-বোনদের মধ্যে সব চেয়ে বড় হলেও অর কথা কেউ খুব একটা পাত্তা দেয় না। মিনমিনে গলায় বলে, – তবে যে বাবলুরা বলে ওরা অ্যাটলান্টায় থাকে। বাবলু ছাড়ার পাত্র নয়। উত্তর দেয়, – কাকুদের ঠিকানাটা দেখেছিস? রস্‌ওয়েল।

বিকাশ মধ্যস্থতা করার জন্য শাশুড়ির কাছে নিতুদের ঠিকানাটা দেখতে চাইল। তারপর ঠিকানার পাতায় চোখ বুলিয়ে বলল, – রস্‌ওয়েল, জি এ ৩০০৭৬… অ্যাটলান্টার নাম-গন্ধও নেই। তারপর মেয়েকে চুপ করানোর জন্য বলল, – নিজের মামা কোথায় থাকে তাও জানিস না?

নয়না তার স্বভাবগত মিহি গলায় বলল, – তুমিও তো জানতে না তোমার শালা কোথায় থাকে!

ঠিক আছে, ঠিক আছে। সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ ফোন করব। আজ নয় ওদের ঘুম ভাঙাব।

সন্ধ্যা হতে না হতেই বাবলু ঘড়ি দেখে বলল, – কাবলুদের ফোন করবে না? বিকাশ বলে, – হ্যাঁ হ্যাঁ। নম্বরটা কি? মা, আপনার ফোন কি আই এস ডি লক করা? বাবলু বলল, – না। লক করা না। আমি জানি। বাবলুই নাম্বার ডায়াল করল। – এই চুপ চুপ। রিং হচ্ছে। ও পাশে মিতা ফোন ধরে। বাবলু গলার চড়িয়ে বলল, – মণিমা, আমি বাবলু।

তোমাদের ওখানে এখন কটা বাজে? মিতা বলল, – এখন প্রায় সাড়ে ন’টা বাজে। কেন রে? বাবলু কেমন চুপসে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, – তোমরা ওয়েস্টে থাক না? আমি ত ভাবলাম এখন ভোর সাড়ে ছটা। – নারে, অ্যাটলান্টা তো ইস্টার্ন টাইমে। – তোমার অ্যাটলান্টায় থাক? ঠিকানায় তো রস্‌ওয়েল লেখা। রস্‌ওয়েল তো ওয়েস্টে। সব ইঊ-এফ-ও-দের আড্ডা ওখানে। – সে রস্‌ওয়েল তো নিউ মেক্সিকোতে। আমরা থাকি অ্যাটলান্টার একটা সাবার্বে।

নয়না বুঝল, এমন সুযোগ ছাড়া উচিৎ না। – এই যে ওস্তাদ, ছোটমামী কি বলল? ওরা অ্যাটলান্টায় থাকে, তাই না? বাবলু গলা নালিয়ে বলল, – ঠিকানাটা উল্টোপাল্টা হলে আমি কি করব? আমি কি করে জানব যে ওরা একগাদা শহরের নাম রস্‌ওয়েল দিয়ে রাখবে!

– মা, চল। ও গাড়ি নিয়ে এসে গেছে। মিতার কথায় চমক ভাঙল। গাড়ি কি? এত মিনিবাস! সরলাদেবী ফিসফিস করে নাতিকে জিজ্ঞাসা করলেন, – হ্যাঁ রে কাবলু, তোর বাবা কি এই মিনিবাসটা চালায় নাকি?

কাবলু ঠাম্মাকে অনেকদিন বাদে দেখছে। একটু হেসে বলল, ঠাম্মা, এটা মিনিবাস না। মিনি-ভ্যান। মা’র গাড়ি।

সরলাদেবী কথাটা শুনে হকচকিয়ে গেলেন। এই ঢাউস গাড়িটা বৌমা চালায়! বলে কি? এদের কি ভয়ডর বলতে কিছু নেই?

ঠাম্মাকে সীটে বসিয়ে, সযত্নে সীট-বেল্ট বেঁধে দিতে দিতে কাবলু বলল, – ঠাম্মা, সীট-বেল্ট খুলবে না কিন্তু। তা’ হলে পুলিশ বাবাকে ফাইন করবে।

গাড়িতে যেতে যেতে মাকে অ্যাটলান্টা শহরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিল নিতু। কিছুক্ষণ পরে আর চেপে থাকতে না পেরে ছেলেকে বললেন, – নিতু, তুই বৌমার জন্য একটা ড্রাইভার রেখে দিস না কেন? এই মিনিবাসের মত গাড়ি চালানোর কি দরকার? গৌর ত রত্নার জন্য ড্রাইভার রেখে দিয়েছে। বিশু তো নামেই গৌরের ড্রাইভার, আসলে তো ও বাড়িতেই ডিউটি দেয়। নিতু অল্প হেসে বলল, – দেশে কথা আলাদা। এখানে কোম্পানির বড় সাহেবও নিজে গাড়ি চালিয়ে আসে।

মিনিট চল্লিশের মধ্যে নিতুদের বাড়ি পৌঁছে গেলেন সরলাদেবী। বেশ খানিকটা জমি নিয়ে নিতুদের বাড়ি। খুবই ছিমছাম, গোছানো। মিতে এসেই চায়ের জল বসিয়ে দিয়েছিল। – মা, তুমি চা খেয়ে স্নান করে নাও। তারপর তাড়াতাড়ি ডিনার করে নেব।

সরলাদেবী তখন কলকাতায় পৌঁছ সংবাদটা দিতে চান। – হ্যাঁ বৌমা, কলকাতায় এখন ফোন করা যাবে?

একটু পরে করি? এখন তো অনেক রাত ওখানে।

– তা হোক। তুমি রত্নাকে ফোন করে বলে দাও। ওরা চিন্তায় থাকবে।


স্টেয়িং


সরলাদেবী অ্যামেরিকায় আসার আগে বাবলু থেকে শুরু ক্রে সকলেই কিছু-না-কিছু তথ্য সরবরাহ করেছে। রাস্তার ডান দিক দিয়ে গাড়ি চলে এখানে তা অনেকের মুখে অনেকবার করে শুনেছেন। রাস্তা পার হবার সময় কোন দিকে আগে তাকাতে হবে বাবলু পাখি-পড়া পড়িয়ে ছিল। কিন্তু এখানে মনে হচ্ছে অনেক কিছুই অন্য রকম। বাথরুমে লাইট জ্বালাতে গিয়ে দেখেন লাইটের সুইচগুলো উলটো। কাবলুকে ডেকে সে কথা বললেন সরলাদেবী। কাবলু তো প্রথমে বুঝতেই পারেনি। সুইচ কেন উলটো হবে? এই তো, ওপরে করলে অন্‌ আর নীচে করলে অফ্‌। সরলাদেবী অবাক হয়ে বললেন, – নীচে করলে অফ্‌? এ তো কখনও শুনিনি!

লাইটের সুইচ দিয়ে শুরু। চায়ের সঙ্গে ‘কুকি’ খাবে কিনা নাতি এসে জিজ্ঞাসা করল। – কুকি? জানি না। কোনদিন খাই নি তো! দেখাও তো একটা, দেখি কেমন।

তুমি কুকি খাওনি হতেই পারে না। কাবলু বিশ্বাসই করতে পারছে না। তারপর একটা চকলেট-চিপ্‌ কুকি এনে ঠাম্মাকে দেয়।

– এ কে তোমরা কুকি বল? আমরা দেশে বিস্কুট বলি।

-বিস্কুট? বিস্কুট কি?

মিতা রান্না করতে করতে ছেলেকে মৃদু ধমক দিল। – তোরা বলিস বিস্কিট, আমরা বলি বিস্কুট।

কাবলু বলে, – ঠাম্মা, বিস্কুট তো ব্রেড-এর মতো খেতে হয়। তোমাকে ম্যাকডোনাল্ড-এ নিয়ে গিয়ে একদিন খাইয়ে আনব।

মিতা রান্নাঘর থেকে বলল, -ঠাম্মা চিকেন খায় না। চিকেন বিস্কিট খাবে না। তারপর শাশুড়িকে বলল, – ও আমাদের বান্‌ রুটির মত অনেকটা।

কথা বলতে বলতে সরলাদেবী ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। জেট-ল্যাগ কাটতে সময় লাগবে। কাবলুর ডাকে ঘুম ভাঙে। মনে হল ও সবে স্নান করে এসেছে। নাতিকে জিজ্ঞাসা করলেন, – সকালে স্নান করনি?

– আমি তো সকালে স্নান করি না। বিকেলে করি।

– কেন রে? সকালে স্নান করলে মাথা দেখবি কেমন ফ্রেশ লাগবে। ঘুম কেটে যাবে।

– তুমি মাকে বল। কাবলু ঠাম্মাকে বলেছিল।

নিতু কিছুক্ষণ কম্পিউটারে বসেছিল। বলল ই-মেল দেখছে। মিতা অকে বলল, – একবার ওয়াল্‌মার্টে যাবে নাকি? আমি দুধটা কিনতে ভুলে গিয়েছি। একটা টু-পার্সেন্ট নিয়ে এস।

– আর কিছু লাগবে?

– না। অ, হ্যাঁ… একটা রোববারের কাগজ নিও।

রোববারে কাগজ? ভুল শুনলেন নাকি? আজ তো শনিবার। ভুলই শুনেছেন বোধহয়। নিতু ফিরে এলো আধ ঘণ্টার মধ্যে। হাতে দুধ আর খবরের কাগজ। হ্যাঁ- রবিবারের কাগজই তো! সরলাদেবীর কেমন যেন সব গুলিয়ে যাচ্ছে মনে হল। ভাবলেন, ঘুমিয়ে পড়েছিলাম ঠিকই। তা এখন কি সকাল? তার মানে কি আজ রবিবার?

ছেলেকে জিজ্ঞাসা করলেন, – হ্যাঁরে নিতু, আজ কি বার রে?

– কেন? শনিবার।

– তা তুই রবিবারের কাগজ কোথায় পেলি? ও কি আগের রবিবারের?

– না মা। এখানে রবিবারের কাগজ শনিবারে পাওয়া যায়।

– একদিনের পরের খবর ছাপায় কি করে?

– মা, এখানে রবিবারের খবরের কাগজ বেশীর ভাগ লোকে কেনে কুপনের জন্য। মিতা কুপনের ব্যাপারে ওস্তাদ।

মিতা হেসে উত্তর দিল, – যা ইচ্ছে বল। কিছু না হলেও প্রতি সপ্তাহে দশ-পনের ডলার বাঁচাই কুপন দিয়ে। কোনদিন তো এপ্রিশিয়েট করলে না। রাত্রে খাওয়া-দাওয়ার পর মিতাই বাসন মাজল। রান্নাঘর পরিষ্কার করল। নিতু ও কাবলু ফুট-ফরমাস খাটছিল। সরলাদেবীর চুপচাপ বসে থাকতে অস্বস্তি হচ্ছিল। মিতা তারপর বসার ঘরে টিভি চালিয়ে জিজ্ঞাসা করল, – দেশের প্রোগ্রাম দেখবে নাকি?

– না, এখন থাক। গল্প করি বরং।

কথাবার্তার মধ্যে বেশ কয়েকটা ফোন এলো। বোঝাই গেল এরা সব নিতুদের স্থানীয় বন্ধুবান্ধব। খবর নিচ্ছে সরলাদেবীর। কেউ কেউ আবার নেমন্তন্ন করছে। এর মধ্যে কাবলুর একটা ফোন এলো। মিতাই ধরেছিল।

– কাবলু, কোচ ব্রাউন, ফোন ধর।

কোচ ব্রাউন? এখানেও কি দেশের মত কোচিং ক্লাসের ঘটা? বাবলু-নয়নার দিকে তাকানো যায় না। স্কুল থেকে ফিরতে না ফিরতেই একটার পর একটা কোচিং ক্লাস। আজকাল স্কুলে মনে হয় পড়াশোনা উঠে গেছে। সরলাদেবীর ছেলেমেয়েরা তো কোনদিন প্রাইভেট টিউটরের কাছে পড়েনি। পড়বার দরকারও হয় নি। মিতা কে জিজ্ঞাসা করলেন, – কলকাতার মত এখানেও কি কোচিং ক্লাসের ঘটা?

– না না, এখানে অ সব চলে না। ওর বাস্কেটবল খেলার কোচ ফোন করেছেন।

কাবলু কথা বলে এসে একা ফাঁকে টিভির চ্যানেল চেঞ্জ করে একটু খেলা দেখে নিলো। সরলাদেবী নাতি জিজ্ঞাসা করলেন, – কি খেলারে এটা?

– ফুটবল।

– ফুটবল? এত মারামারি করে ফুটবল খেলে নাকি?

– ঠাম্মা, এটা অ্যামেরিকান ফুটবল। ওরা মারামারি করছে না। ওটাকে ট্যাকেল করা বলে। তুমি সকারের কথা ভাবছ।

– ঐ হল। আমরা সকার-টকার বলি না। ফুটবল বলি। ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান… খুব নামকরা টীম। তা তুমি এইসব মারামারি খেলা খেল নাকি?

– আমি বাস্কেটবল খেলি। মা কিছুতেই ফুটবল খেলতে দেয়না।

– মা ঠিকই বলে। মা’র কথা শুনবে। ও সব মারামারি খেলা না খেলাই ভাল।

সরলাদেবী অ্যামেরিকায় এসেছেন প্রায় তিন সপ্তাহ হয়ে গেছে। এখন জেট-ল্যাগ আর নেই। সারাদিন শুয়ে বসে সময় কাটান। নাতির গরমের ছুটি তাই রক্ষে। রাতে একটু চিন্তাই হয়। কলকাতায় আজকাল চুরি-ডাকাতি বেশ বেড়েছে। আসার আগে কোল্যাপ্‌সিবল্‌ গেট লাগিয়েছেন বড় দরজায়। তবু চিন্তা হয়। এখানকার জন্যও হয়। এখানকার বাড়ির দেওয়াল যা পলকা! তার ওপরে জানলাগুলোও কাঁচের। নিতুকে সে কথা বলাতে নিতু মুচকি হেসে বলল, – চিন্তা করোনা, ইন্‌সিওরেন্স করা আছে।

আজ শনিবার। সবাই হাতের কাজ সারছে। সরলাদেবীর স্নানাদি, পুজো হয়ে গেছে। মিতা গ্রোসারি শপিং করতে গেছে। ও বেরোনোর আগে বলে গিয়েছে যে মাইক্রোওয়েভে বাটিতে দুধ রাখা আছে। নিতু যেন এক মিনিট গরম করে দেয়। নিতুকে দু-চার বার ডাকাতে কাবলু উঠে এসে বলল, – ঠাম্মা, বাবা বাইরে ঘাস কাটছে।

সরলাদেবী কথাটা শুনে একটু হকচকিয়ে গেলেন। – ঘাস? তোদের আবার ঘোড়া আছে নাকি?

– আরে দূর! ঘোড়া থাকবে কেন? বাবা বাইরে লনে আছে। ডেকে দেব?

– না থাক। তুই আমার দুধটা একটু গরম করে দে তো।

কয়েকদিন ধরে নিতুকে বলব বলব ভাবছিলেন সরলাদেবী। একটা কাজের লোক রাখলেই তো পারে। মিতার সারাদিন একটু অবসর নেই। মেয়েটা এত ভাল নাচ করত। কোথায় নাচ প্র্যাকটিস করবে – তা না! বাজার করছে, রান্না করছে, বাসন মাজছে, ঘর পরিষ্কার করছে, বাথরুম পরিষ্কার করছে! আর নিতু? সে বাইরে ঘাস কাটছে? এর জন্যেই কি এত পড়াশোনা শিখিয়েছে বাবা-মা? এখানকার ব্যাপার-স্যাপার সব অদ্ভুত! বিকেলে আবার নেমন্তন্ন। কোন কারণ নেই – এমনিই। প্রথমে পার্টি কথা শুনে একটু পিছিয়ে গিয়েছিলেন। গিয়ে দেখলেন এলাহি ব্যাপার। প্রত্যেকটি পরিবারই একটা গিফট ব্যাগ ঢোকার মুখে এক কোনে রেখে দিচ্ছে। সরলাদেবী ভাবছে, – তবে যে বলল নিমন্ত্রণের কোন কারণ নেই! কি জানি, কি ব্যাপার। প্রায় দশ-বারটি পরিবার এলো। দেখে ভাল লাগল, বৌয়েরা সকলেই ভারতীয় পোশাক পরা। বেশির ভাগই শাড়ি। কেউ কেউ সালোয়ার-কামিজ। ছেলেরা একদিকের ঘরে বসল, প্রায় প্রত্যেকের হাতেই বিয়ারে বোতল। যস্মিন্‌ দেশে যদাচর! সামনে টিভি চলছে। খেলা দেখাচ্ছে। এরা আবার ক্রিকেট খেলে না – বেসবল খেলে। কেউ খেলা দেখছে বলে মনে হল না। ছেলেদের গলার আওয়াজে মনে হল রাজনীতি নিয়ে কথা বলছে। মেয়েরা অন্য ঘরে বসে কলকাতা মতই পরনিন্দা-পরচর্চায় মেতে উঠেছে। মাঝে মধ্যে কোন হিন্দি সিনেমা কবে রিলিজ করছে সে সংবাদ আদান-প্রদান করছে। একেবারে কচি-কাঁচারা নিজেদের মধ্যে দৌড়াদৌড়ি করছে। আর একটু বড়রা একটা ঘরে বসে ভিডিও গেম খেলছে। সরলাদেবী নিরামিষ খান, তাই তাঁর জন্য নানা রকম তরি তরকারি। কে বলবে এটা কলকাতা না? সুক্ত, বেগুন থেকে শুরু করে দই-মিষ্টি। মাছ-মাংস তো আছেই! বাড়িতে বানান সব। নাঃ, বৌগুলোর গুণ আছে। সারাদিন এত কাজ করার পরেও সময় পায় কি করে এত রান্না করার?

দেখতে দেখতে চার মাস কেটে গেছে। ইতিমধ্যে নিতুরা নায়াগ্রা ফলস, নিউ ইয়র্ক, ওয়াক্সিংটন ডিসি, দেখিয়ে এনেছে। গাড়ি করেই গেছেন। রাতে মোটেলে থেকেছেন সবাই মিলে। সকালে উঠে স্নান-ব্রেকফাস্ট করে আবার বেরিয়ে পড়েছেন গাড়িতে। নিতুরা যখন প্রথম প্রথম বেড়াতে যাবার কথা বলেছিল, সরলাদেবীর খুব একটা খুব একটা উৎসাহ ছিল না। অ্যাটলান্টায় একটা পাথরের ঢিপিকে এরা ‘মাউন্টেন’ বলে – স্টোন মাউন্টেন; একটা খালকে বলে ‘রিভার’ – চাটাহুচি রিভার। একটা পুকুরের পারে বালি ঢেলে বলে নাকি বীচ। গঙ্গা-হিমালয়ের দেশ থেকে এসে প্রহসন মনে হত। কিন্তু সে মনোভাব নায়াগ্রা-যাত্রাতেই কেটে গেছে।

দুর্গা পুজোর কটা দিন বেশ ভালই কাটল। শুক্র, শনি, রবি মিলিয়ে আড়াই দিনের পুজো। তিথির ধার ধার বলে মনে হল না। তবে বিচিত্রানুষ্ঠান, ধুনুচি প্রতিযোগিতা, শাড়ি-গয়না-সিডির স্টল, ম্যাগাজিন- আয়োজনের ত্রুটি নেই। আর খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারও বেশ এলাহি। এত বাঙালি আছে এখানে? মনে হল, সবাই সারাদিনের জন্য চলে আসে এবং রাতে বিচিত্রানুষ্ঠানের শেষে বাড়ি চলে যায়। নিতুরা অবশ্য কাছাকাছি একটা হোটেল নিয়েছিল। নিতু সকালে পুজোর ওখানে চলে যেত। বাকি সবাই দেরীতে। ছোটরা বেশ সুন্দর একটা রূপকথা পরিবেশন করল। বড়রা একটা নাটক। আর মেয়েরা একটা নৃত্যনাট্য। বেশ ভাল লাগল। কলকাতার পাড়ার পুজোয় এসব বড় একটা দেখা যায় না আজকাল। যদি ছোট বাচ্চাগুলো একটু চুপ করে বসে অনুষ্ঠান দেখত, তা ‘ হলে আরও ভাল লাগত। বড্ড দৌড়োদৌড়ি করে। তা’ কি আর করা যাবে?


‘গোইং’


সকাল থেকে থমথমে ভাব। সরলাদেবীর কলকাতা ফিরে যাবার দিন এসে গেছে। বিকেল পাঁচটায় ফ্লাইট। অ্যাটলান্টা থেকে প্যারী হয়ে দিল্লি। তারপর জেট এয়ারে কলকাতা। নিতুদের এক বন্ধু অনিমেষ সপরিবার কলকাতা যাচ্ছে।তাদের সঙ্গেই যাবেন তিনি।

কেন এমন হয়? পাঁচ মাস বাদে দেশে ফিরছেন। বাবলু-নয়নারা ব্যস্ত হয়ে গেছে। এদিকে কাবলুর চোখের দিকে তাকানো যায় না। ও মুখে কিছু বলছে না কিন্তু বুক ভরা কান্না।

কেন এমন হয়? এক প্রিয়পাত্র কে কাছে পেতে হলে আর একজন কে ছেড়ে যেতে হয়। বিয়ের পর বাপের বাড়ি থেকে শ্বশুর বাড়ি যাবার সময়ও ঠিক এমন ভাবেই হাসি-কান্নায় মন ভরে উঠত। কেন এমন হয়? কাউকে ছেড়ে যাবার কষ্ট; অন্য কাউকে ফিরে পাবার আনন্দ!

এয়ারপোর্টে কাবলু খুব কেঁদেছে। মিতা ও নিতুর চোখেও জল। মনে মনে ভেবেছেন, যে যেখানে থাকে সুখে থাক। শান্তিতে থাক। জীবনের পথ যাকে যেদিকে নিয়ে যাবে তাকে তো সেদিকে যেতেই হবে। ছোট্ট পৃথিবীটা আরও ছোট হয়ে যাচ্ছে, এটাই সান্ত্বনা। সরলাদেবী জানেন, কলকাতা যেতে যেটুকু সময় পাবেন, তার মধ্যেই একদিকের কান্নাটা চাপা দিয়ে অন্যদিকের জন্য মুখে হাসি বার করে আনতে হবে। যতই কষ্ট হোক। বাবলু-নয়নারা সকলেই যে দমদম এয়ারপোর্টে আসবে।

Copyright © 2015 - 2022, Raktim Sen