My Stories

চ্যাপলিন, আইনস্টাইন ও একটি পিয়ানো

[লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় প্রতীচী, ২০১৫, (পূজা সংখা)]

৩০শে জানুয়ারি, ১৯৩১ সাল। ‘City Lights’-এর প্রিমিয়ার সিনেমা জগতের পীঠস্থান, লস্‌ এঞ্জ্যালেস শহরে। Guest of Honor অ্যালবার্ট আইনস্টাইন। চার্লি চ্যাপলিনের সাথে একসঙ্গে প্রেক্ষাগৃহে প্রবেশ করলেন। আইনস্টাইনের স্ত্রী এল্‌সাও ওদের সঙ্গে ।

City Lights’ নিয়ে চার্লির একটা বিরাট টেনশন। সিনেমার সবাক যুগের গোড়াপত্তন হয়ে গেছে। কিন্তু চার্লি তবু নির্বাক থাকতে চাইলেন। তা’ছাড়া এই ছবিটির আবহসঙ্গীতও ওর নিজের রচনা। ছায়াছবি শেষ হতে না হতেই ‘স্ট্যান্ডিং ওভেশন’ – চার্লি চ্যাপলিন তা’ হলে সবাক সিনেমার যুগেও নির্বাক ছবি দিয়ে সবাইকে মাতাতে পারেন। দর্শকদের করতালি থামতেই চায় না। আইনস্টাইনও অভিভূত। চার্লি এগিয়ে এসে এল্‌সার সাথে করমর্দন করলেন। এলসা তাকে অভিনন্দন জানালেন  – দারুণ হয়েছে। চার্লি ওকে ‘থ্যাংকস’ জানিয়ে  আইনস্টাইনের দিকে হাত বাড়ালেন। অ্যালবার্টের মুখে এক গাল হাসি। – কিছু বলার নেই। এক কথায় অসাধারণ। What I most admire about your art, is your universality. You don’t say a word, yet the world understands you!  

চ্যাপলিন মৃদু হেসে বললেন, True. But your glory is even greater! The whole world admires you, even though they don’t understand a word of what you say.

– এবার তো ইউরোপে যাবেন, বার্লিনে একবার আমাদের বাড়িতে আসুন। এল্‌সার অনুরোধ।

– নিশ্চয়ই যাব। City Lights’ লন্ডনের প্রিমিয়ারের পর আপনাদের ওখানে যাব – ঠিক করেই রেখেছি।

এ এক অদ্ভুত সম্পর্ক – আইনস্টাইন বিশ্ববন্দিত বৈজ্ঞানিক – অথচ তিনি ছিলেন চ্যাপলিনের ফ্যান। মনে হয়, আইনস্টাইন নিজের অন্তরের প্রতিমূর্তি দেখতে পেতেন রূপোলী পর্দায় চ্যাপলিনের চরিত্র গুলির মধ্যে। তাই চ্যাপলিনকে খুব কাছের মনে হত।

City Lights’এর লন্ডনের প্রিমিয়ারের পর চ্যাপলিন বার্লিনে চলে গেলেন আইনস্টাইনদের বাড়ি। আমেরিকার তুলনায় নিতান্তই ছোট্ট ওদের বাসস্থান। এককোণে ওর কালো Blüthner পিয়ানোটি রাখা। বাজাচ্ছেন আইনস্টাইন।  খেয়াল নেই যে বাড়িতে অতিথি। মিসেস আইনস্টাইন, একটু মজা করেই বললেন, -আপনাদের অ্যামেরিকার মত, সবকিছু এত বড় বড় নয় আমাদের। তা’ছাড়া আপনাদের প্রফেসরের তো পয়সা কড়ির বোধটা খুবই কম। প্রিন্‌স্‌টন ইউনিভার্সিটি ওর কাছে জানতে চায়, উনি কত মাসিক বেতন আশা করেন। উত্তরে ও এমন একটা রকম বলেছিলেন, যে ওরা তো হেসেই গড়াগড়ি! – এই মাইনেতে এখানে চলেনা মশাই! তারপর যা চেয়েছিলেন তার তিন গুণেরও বেশি মাইনে দিয়ে ওঁকে তারা নিয়ে যায়।

পিয়ানোটি দেখে চ্যাপলিনের মনে পড়ে গেল পাঁচ-বছর আগের কথা। ১৯২৬ সাল। চ্যাপলিন ওর Circus’ ছবিটি নিয়ে ব্যস্ত। ইউনিভার্সাল স্টুডিও থেকে ফোন এলো চ্যাপলিনের কাছে। ইউনিভার্সাল স্টুডিওর প্রতিষ্ঠাতা, স্বয়ং কার্ল লেমলি’র ফোন – প্রফেসর আইনস্টাইন সস্ত্রীক দেখা করতে চান। কি সাংঘাতিক ব্যাপার! সারা বিশ্ব যাকে বন্দনা করে, সেই আইনস্টাইন চান দেখা করতে!  সাময়িক উত্তেজনা কাটিয়ে উঠে, স্টুডিওতে চলে গেলেন চ্যাপলিন। লাঞ্চে ডেকেছেন মিস্টার লেমলি।

যথা সময়ে আইনস্টাইন এলেন ইউনিভার্সাল স্টুডিওতে। সঙ্গে এল্‌সা, সেক্রেটারি হেলীন ডিউকস এবং আইনস্টাইনের ‘Calculator’ ওয়ালথার মেয়ার। এলাহি ব্যাপার। প্রফেসর আইনস্টাইন বলে কথা! বিশ্ব-বন্দিত বৈজ্ঞানিক- পাঁচ বছর আগে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। অনেকেই তো তাঁকে দেখতে চান, ওঁর সঙ্গে কর মর্দন করতে চান।  লাঞ্চের পরে, মিস্টার লেমলি সকলকে স্টুডিও দেখাতে নিয়ে বেরলেন। আইনস্টাইন উপভোগ করছেন লেমলির আতিথেয়তা। কিন্তু কোথায় যেন একটা ছন্দপতনের আভাস। মিসেস আইনস্টাইন চ্যাপলিন কে আড়ালে ডেকে নিয়ে বললেন, – আমার মনে হয়, প্রফেসর এত ভিড় চাননি। আপনি প্রফেসরকে আপনার বাড়িতে নিমন্ত্রণ করলে ওর খুবই ভাল লাগবে। তা’ হলে একটু নিরিবিলিতে প্রফেসর আপনার সঙ্গে কথা বলতে পারবেন।

তথাস্তু! চ্যাপলিন ওঁদের এবং দু’জন ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে নিমন্ত্রণ করলেন ডিনারে। চারজন অতিথি- চ্যাপলিনকে নিয়ে পাঁচ।মিসেস আইনস্টাইনের অনুরোধে বেশী কাউকে ডাকেননি। কিন্তু একটু নিরিবিলিতে কথা বলার কথা দিয়ে অনেক প্রত্যাশা নিয়ে যাকে নিমন্ত্রণ করা, তিনি আড্ডা ছেড়ে আপন মনে চার্লি চ্যাপলিনের কালো Blüthner পিয়ানোটি বাজাচ্ছেন। বাজনা বাজানোর সুযোগ আইনস্টাইন কখনই ছাড়তে পারতেন না। সে বেহালাই হোক, চেলোই হোক বা পিয়ানো। যখন বাজাতেন, তার ধ্যান-জ্ঞান সবই ওই বাজনায়। দুচোখ বুঁজে, একাত্ম হয়ে বাজাতেন।

এল্‌সা আইনস্টাইনই কথা বলছিলেন বেশী। ইংরাজিটা ভালই বলতেন। অন্তত আইনস্টাইনের তুলনায় তো বটেই। নানা রকম বিষয়ে আলোচনা চলছিল। আইনস্টাইন আড্ডায় যোগদান করার পর  অতিথিদের একজন ওর পিছনে একটু লাগার চেষ্টা করেছিলেন। তেমন সুবিধা হয়নি। কারণ প্রশ্নের এমন উত্তর দিয়েছিলেন যে তার মানে উদ্ধার করতে প্রশ্ন কর্তার ঘাম ছুটে গিয়েছিল।

ডিনারে কথা বলতে বলতে প্রফেসরের পিয়ানো বাজানোর কথা আবার উঠল। মিসেস আইনস্টাইন এবার একটি ঘটনা বলনেন যা একদিকে যেমন অদ্ভুত তেমনি ঐতিহাসিক। – প্রফেসর রোজকার মত সেদিন সকালেও ব্রেকফাস্ট করতে ওর ড্রেসিং গাউন পরে বের হয়ে আসেন। খেতে খেতে বলেন, -আমার মাথায় একটা অদ্ভুত আইডিয়া ঘুরপাক খাচ্ছে! তারপর কফি শেষ করে ও পিয়ানো বাজাতে বসে। বাজানো চলতে থাকে। মাঝে মধ্যে থামে। কিছু একটা লিখে আবার বাজাতে থাকেন।  মাঝে মধ্যে চিৎকার করে বলে চলেছেন, -এল্‌সা, শুনছ?  আমার মাথায় একটা অদ্ভুত আইডিয়া ঘুরপাক খাচ্ছে!

এল্‌সা আর থাকতে না পেরে জিজ্ঞাসা করলেন, – কি আইডিয়া বলবে তো!

প্রফেসর বলেন, – বোঝানো একটু কঠিন। আরও একটু সময় লাগবে। বলেই আবার পিয়ানো বাজাতে শুরু করেন। তারপর আরও প্রায় আধ-ঘণ্টা বাজানোর পর এল্‌সাকে ডেকে বলেন, -আমাকে যেন কেউ বিরক্ত না করে। তারপর ওর পড়ার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেন। খাওয়া-দাওয়া সব ঘরেই। বিকেলের দিকে একটু হাঁটতে বেরতেন। তারপর আবার পড়ার ঘরে।  প্রায় দু-সপ্তাহ পরে বেরলেন, ক্লান্ত, শ্রান্ত একটি মানুষ- হাতে রাইটিং প্যাডের দুটি পাতা- তাত্তে কিছু লেখা।

সকলেই জানতে উৎসুক – কি লেখা ছিল তাতে?

মিসেস আইনস্টাইন মৃদু হেসে বললেন, Theory of Relativity!

চার্লি চ্যাপলিন বিস্মিত। – পিয়ানো বাজাতে বাজাতে Theory of Relativity!

পরিশিষ্ট

১৯৩১ সালেই এডলফ হিটলার জার্মানির চ্যান্সেলর পদে নির্বাচিত হন। ১৯৩৩ সালে আইনস্টাইনরা যখন অ্যামেরিকাতে এসেছিলেন ওরা তখনই অনুভব করেছিলেন যে জার্মানিতে ওদের ফিরে যাওয়া হবে না।নাৎসিরা ওদের বাসস্থানের ছোট্ট কটেজটিতে Youth Camp খুলেছে। ওর সখের sail boat-টও ওদের দখলে ।

আর সেই  কালো Blüthner পিয়ানোটি, যেটি বিজ্ঞানের একটি অন্যতম আবিষ্কারের সঙ্গী এবং সাক্ষী? কে জানে? Theory of Relativityর শত বার্ষিকিতে  হয়ত কারও বাড়ির এক কোণায় পড়ে আছে – কেউ হয়ত কখন-সখন বাজায়। কিংবা সবার দৃষ্টির আড়ালে পড়ে আছে কোনও পুরোনো পিয়ানোর দোকানে। কিংবা হয়তো নাৎসিরা ওটিকে জ্বালানি কাঠ হিসেবে ব্যবহার করেছে। কে জানে?


Bibliography

Einstein : his life and universe: by Isaacson, Walter (Simon & Schuster, New York)

Einstein: A Biography: Neffe, Jürgen; (Translated by Shelley Frisch); (Farrar, Straus and Giroux, New York)

My Autobiography: Charles Chaplin (Plume, New York)

Copyright © 2015 - 2022, Raktim Sen